উচ্চমূল্যে পিষ্ট স্বল্প আয়ের মানুষ - protidinislam.com | protidinislam.com |  
সারাদেশ

উচ্চমূল্যে পিষ্ট স্বল্প আয়ের মানুষ

  প্রতিনিধি ১৫ মার্চ ২০২২ , ৩:০১:০৮ প্রিন্ট সংস্করণ

Spread the love

ইসলাম ডেস্কঃ চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, আলু, চিনি, পেঁয়াজ, আদা, বিভিন্ন রকম সবজি, আটা, ডিম, দুধসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্য গত কয়েক মাস ধরে বাড়তির দিকেই যাচ্ছে। পবিত্র মাহে রমজানের আর মাত্র ১৫ দিন বাকি।

এরই মধ্যে গত কিছুদিন ধরে দৃশ্যমান কোনো কারণ ছাড়াই নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রতি বছরই রমজান মাস সামনে রেখে আগে থেকেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে নেয়ার অঘোষিত একটি ঘৃণ্য চেষ্টা চালিয়ে থাকেন ব্যবসায়ীরা। বাড়তি দামের চাপে দেশের জনগোষ্ঠীর বড় অংশই সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে নিত্যপণ্যের দাম স্বল্প আয়ের মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও তা কোনো কাজে আসছে না। ফলে উচ্চমূল্যের চাপে পিষ্ট হচ্ছে স্বল্প আয়ের মানুষ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কিছু পণ্যের দাম বিশ্ব বাজার থেকে চড়া দামে আমদানি করতে হচ্ছে।

ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ দুষছেন সিন্ডিকেট ও সরকারের অপর্যাপ্ত পদক্ষেপকে। মন্ত্রীরা কেউ কেউ মনে করছেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় দ্রব্যমূল্য সেভাবে বাড়েনি। তারা বরং বিশ্ববাজারের উচ্চমূল্য ও অস্থিরতাকে প্রধান কারণ মনে করছেন।

আর ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এখন যাবতীয় দায় এই যুদ্ধের ওপর চাপিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই দায় সারছেন। রাজধানীর খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম।

বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের বিপণন বিভাগে কাজ করেন। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে মোটামুটি কাটছিল তাদের সংসার। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে নাভিশ্বাস উঠেছে তার। বেতন থেকে একটি অংশ বাবা-মাকে পাঠাতেন। কিন্তু এখন আর সেটা সম্ভব হচ্ছে না।

তাই তিনি চিন্তা করছেন দ্রব্যমূল্যের এভাবে ঊর্ধ্বগতি চলতে থাকলে স্ত্রী-সন্তানদের গ্রামে পাঠিয়ে দেবেন। নজরুল ইসলাম বলেন, মাস শেষে যা বেতন পাই তা দিয়ে চলছিল আমাদের।

কিন্তু এখন বাজারে ৬০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। তেলের দাম লিটার ২০০তে ধাক্কা দিয়েছে। বাজারে গেলে সব কেনাকাটা করতে পারি না। অতিরিক্ত চাপে পরিবারেও অশান্তি হচ্ছে।

এভাবে চলতে থাকলে স্ত্রী-সন্তানকে গ্রামে পাঠিয়ে মেসে উঠবেন তিনি। জানতে চাইলে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চেয়ারম্যান গোলাম রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে শুধু স্বল্প আয়ের না মধ্যম আয়ের, যাদের বেতন ৫০-৬০ হাজার টাকা তাদেরও নাভিশ্বাস উঠেছে। এর কারণ কোভিডের কারণে অনেকের আয় কমে গেছে।

চাকরি হারিয়েছে অনেকেই। এজন্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ব্যবসায়ীদের একটি হীন সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে সেটা হলো রমজান এলেই তারা সারা বছরের আয় এক মাসে করতে চায়। এজন্য সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। তবে বর্তমানে শুধু সিন্ডিকেটের কারণেই দাম বাড়ছে এমনটি বলতে নারাজ তিনি।

তার মতে, বিশ্ববাজারে সব কিছুর দাম বেশি। ব্যবসায়ীরা চাইলেও কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে রোজার আগে ক্রেতাদের পাইকারি বাজার থেকে পণ্য ক্রয়ের পরামর্শ দেন তিনি। তাতে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সাশ্রয় হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের প্রধান নির্বাহী কামরুজ্জামান বাবলু বলেন, বাংলাদেশে চাল ও গম ছাড়া আর কোনো খাদ্যপণ্য আমদানিতে সরকারের কোনো ভূমিকা নেই বললেই চলে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ টিসিবি যেসব পণ্য আমদানি করে, সেগুলোও বেসরকারি ডিলারদের মাধ্যমে করা হয়।

ফলে ভোগ্যপণ্য আমদানির প্রায় পুরোটাই বেসরকারি খাতের কব্জায়। আবার এদের মধ্যে অল্প কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান আমদানির বেশির ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

সেজন্য অভিযোগ করা হয়, কিছু বড় আমদানিকারক সিন্ডিকেট বা নিজেদের মধ্যে চক্র করে রেখেছে যাতে অন্য কেউ সেখানে ঢুকতে না পারে। তবে এই সক্ষমতার শক্তি যখন অনেক বেশি হয়ে যায়, তখন তা সমস্যা সৃষ্টি করে। কেননা সরকারের পক্ষেও একে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না।

আর তাই বাজারে দাম ওঠানামায় এসব বড় প্রতিষ্ঠানই মূল নিয়ামক হয়ে ওঠে। আসন্ন রমজান মাস উপলক্ষে সারা দেশে এক কোটি পরিবারকে কম মূল্যে টিসিবির মাধ্যমে দুই দফায় সয়াবিন তেল, চিনি, ডাল, ছোলা, পেঁয়াজ ও খেজুর সরবরাহ করা হবে।

এ জন্য বিশেষ কার্ড দেয়া হবে যা দেখিয়ে কার্ডধারীরা নিয়মিত বাজারদরের চেয়ে কম মূল্যে এসব পণ্য কিনতে পারবেন। এজন্য আট বিভাগে টাস্কফোর্সও গঠন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

তবে এই ধরনের পদক্ষেপে নিম্ন আয়ের মানুষকে সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তি দেয়া গেলেও মূল সমস্যার অর্থবহ কোনো সমাধান আসবে না বলে মনে করেন ভুক্তভোগীরা। তবে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিকে খারাপ দৃষ্টিতে দেখছে না সরকার।

সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, গত ১৩ বছরে বাংলাদেশে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা প্রায় তিনগুণ বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে প্রায় সাড়ে চারগুণ।

পাশাপাশি ভারত, ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গত কয়েক বছরে সব ভোগ্যপণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, বাংলাদেশে মূল্যবৃদ্ধি সেই তুলনায় অনেক কম।

নিত্যপণ্যের দাম কমাতে উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। তবে সরকারের এসব উদ্যোগ কোনো কাজে আসছে না। গতকাল সোমবার বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন আমদানি পর্যায়ে শুল্ক ১০ শতাংশ কমাতে।

সেটা যদি হয়, তাহলে বর্তমানে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিয়ে তেল আমদানি করা হয়। সেখান থেকে ১০ শতাংশ কমানো হলে ভ্যাট ৫ শতাংশ হচ্ছে। উৎপাদন পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা হচ্ছে এবং ভোক্তা পর্যায়েও ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমানোর ক্ষমতা আমাদের নেই। দাম কমবে কিনা ব্রাজিল বলতে পারবে, কারণ ৯০ শতাংশ তেল আমরা সেখান থেকে আমদানি করি। পণ্যের কোনো সঙ্কট আছে কিনা জানতে চাইলে টিপু মুনশি বলেন, আমাদের যথেষ্ট পরিমাণ পণ্য মজুদ আছে। সেটা দিয়ে রমজান মাস পার হয়ে যাবে।

এখন দামটা কেমন হবে সেটি কথা হতে পারে। কেউ কেউ মজুদ করে রাখছে, সেটি বড় সমস্যা। টিসিবিও এক কোটি পরিবারকে পণ্য দেয়ার জন্য প্রস্তুত।

সামনের দিনগুলোতে পণ্যের দাম কেমন হবে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, পণ্যের দাম কমতেও তো পারে। আমরা চেষ্টা করছি, রমজান পর্যন্ত আগের দামটা রাখার জন্য।

আমরা ১৩৫০ ডলার দাম ধরে ১৬৮ টাকা প্রতি লিটার তেলের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছি। বর্তমানে সে তেল ১৯০০ ডলার হয়ে গেছে।

মন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবেই। এজন্য তাদের অনুরোধ জানিয়েছি রমজান মাস পর্যন্ত জিনিসপত্রের দাম না বাড়াতে। বাইরের দেশে কোম্পানিগুলো রমজান বা ঈদে ডিসকাউন্টসহ বিভিন্ন অফার দেয়, আমাদের দেশে সেটি নেই।

পণ্যের ওপর ভ্যাট লাঘবের নির্দেশ : বাসস জানায়, মন্ত্রিসভা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে ভোজ্যতেল ও চিনিসহ প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের আমদানির ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট যতটা সম্ভব হ্রাস করার জন্য গতকাল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নির্দেশ দিয়েছে।

মন্ত্রিসভা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে এই নির্দেশ কার্যকর করতে বলেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে নিয়মিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে বাজার পরিস্থিতির ওপর অনির্ধারিত এক আলোচনায় এ নির্দেশনা দেয়া হয়।

বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা মনে করি, বাজারে এ সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে।

আরও খবর

Sponsered content

ENGLISH